মেয়েটি পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছে সে বিয়ে করবে না। অন্তত এখন নয়। “এটা আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত।”
ছেলেটি চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। মা-বাবা ভেবেছিলেন তিনি সংসারের হাল ধরবেন। “আমার জীবন আমি কীভাবে কাটাব, সেটা আমার ব্যাপার।”
আরেকজন বাবা ছেলের বিয়েতে সাত লাখ টাকা খরচ করছেন, ধার করে। “লোকে কী বলবে? এটা আমার সম্মানের প্রশ্ন।”
লক্ষ করুন — প্রথম দুজন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভাষায় কথা বলছেন, তৃতীয়জন সমাজের চাপের ভাষায়। এবং আমাদের সমাজে এই দুটি প্রবণতা একই সঙ্গে, একই পরিবারে বসবাস করে।
তাই এই লেখাটি এক পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। দুই প্রান্তের বিরুদ্ধেই।
মতবাদটির মূল দাবি
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism) একটি সরল দাবি থেকে শুরু হয়: সমাজের মূল একক ব্যক্তি।
পরিবার, গোত্র, উম্মাহ — এগুলো ব্যক্তিদের সমষ্টি মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। প্রতিটি ব্যক্তি নিজের জীবনের মালিক। তার শরীর, তার সময়, তার সম্পদ — সবকিছুর ওপর তার সার্বভৌম অধিকার। যতক্ষণ সে অন্যের সরাসরি ক্ষতি না করছে, ততক্ষণ কেউ তাকে কিছু বলতে পারে না।
এই দাবির ভালো দিক অস্বীকার করা যায় না। এর ওপর দাঁড়িয়েই দাসপ্রথার বিরুদ্ধে যুক্তি এসেছে, জোরপূর্বক বিয়ের বিরুদ্ধে আইন হয়েছে, ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে। যেখানে ব্যক্তি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায় — সেখানে অত্যাচার সহজ হয়।
সমস্যা দাবিটিতে নয়। সমস্যা দাবিটিকে চূড়ান্ত করে তোলায়।
যেখানে এটি ভেঙে পড়ে
প্রথম সমস্যা: কোনো সিদ্ধান্তই আসলে ব্যক্তিগত নয়।
একজন মানুষ যদি সিদ্ধান্ত নেন তিনি বিয়ে করবেন না, সেটি তাঁর একার জীবনে থামে না — তাঁর বৃদ্ধ মায়ের জীবনে, ভবিষ্যতে না-জন্মানো সন্তানের জীবনে, এবং সমাজের কাঠামোয় তার প্রভাব পড়ে। একজন মানুষ যদি সুদে ঋণ নিয়ে বিলাসিতা করেন, তাঁর সন্তানরা ঋণের বোঝা পায়।
আমরা জালের একেকটি গিঁট। গিঁট নিজেকে স্বাধীন ভাবতে পারে, কিন্তু সুতো টানলে পুরো জাল কাঁপে।
দ্বিতীয় সমস্যা: মালিকানার দাবিটি ভুল।
“এটা আমার শরীর” — এই বাক্যটি ইসলামি দৃষ্টিতে ভুল ভিত্তিতে দাঁড়ানো। শরীর আপনার সৃষ্টি নয়; আপনি এটি বানাননি, চাননি, বেছে নেননি। এটি আপনার কাছে আমানত। আমানতদার আমানতের মালিক নন — রক্ষক।
তৃতীয় সমস্যা: এটি একাকিত্ব উৎপাদন করে।
যে সমাজ ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয়, সেখানে সম্পর্ক হয়ে যায় চুক্তি — যতক্ষণ লাভজনক, ততক্ষণ। ফল হলো বিবাহবিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি, বৃদ্ধাশ্রমের প্রসার, এবং এমন এক প্রজন্ম যারা মুক্ত কিন্তু একা। পশ্চিমা সমাজ এই মূল্য এখন প্রকাশ্যে দিচ্ছে; আমরা সেদিকেই হাঁটছি।
কিন্তু উল্টো দিকটিও দেখতে হবে
এখন সৎ হওয়ার পালা।
উপমহাদেশে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের চেয়ে বড় সমস্যা প্রায়ই তার বিপরীতটি — ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলা।
মেয়ের মতামত না নিয়ে বিয়ে ঠিক করা। ছেলের যোগ্যতা ও আগ্রহ উপেক্ষা করে বাবার পছন্দের পেশা চাপিয়ে দেওয়া। পুত্রবধূকে ব্যক্তি হিসেবে নয়, ঘরের একটি কার্যকারিতা হিসেবে দেখা। “লোকে কী বলবে” — এই একটি প্রশ্নের কাছে সন্তানের সুখ, এমনকি শরিয়তের বিধানকেও বিসর্জন দেওয়া।
এগুলো ইসলাম নয়। এগুলো সংস্কৃতি — এবং কিছু ক্ষেত্রে ইসলামের সরাসরি বিরোধী।
ইসলাম বিয়েতে নারীর সম্মতিকে শর্ত করেছে। ইসলাম প্রতিটি ব্যক্তিকে তার নিজের আমলের জন্য এককভাবে দায়ী করেছে — কেয়ামতের দিন কেউ কারও বোঝা বইবে না। ইসলাম নারীকে স্বাধীন সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে, যা ইউরোপ পেয়েছে অনেক পরে।
অর্থাৎ ইসলামে ব্যক্তি আছে। ব্যক্তির মর্যাদা আছে, অধিকার আছে, সিদ্ধান্ত আছে।
তাহলে পার্থক্য কোথায়?
ইসলামের অবস্থান
পার্থক্য একটি শব্দে: কর্তৃত্ব।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বলে — ব্যক্তি নিজেই নিজের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ।
পরিবারতন্ত্র বলে — পরিবার বা সমাজ চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ।
ইসলাম বলে — চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ আল্লাহ।
এবং এই তৃতীয় অবস্থানটিই একইসঙ্গে ব্যক্তিকে সমাজের অত্যাচার থেকে এবং সমাজকে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচার থেকে রক্ষা করে। কারণ যখন কর্তৃত্ব উপরে, তখন বাবাও বলতে পারেন না “আমি বলেছি তাই”, আবার সন্তানও বলতে পারে না “আমার ইচ্ছা তাই”। দুজনকেই একই মানদণ্ডে যেতে হয়।
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
হাদিসটি খেয়াল করুন। এখানে কারও অধিকার বলা হয়নি — বলা হয়েছে দায়িত্ব। ইসলামি কাঠামোতে ক্ষমতা মানে সেবা, মালিকানা নয়। স্বামী পরিবারের দায়িত্বশীল, কিন্তু তাঁকেও জিজ্ঞাসা করা হবে। বাবা দায়িত্বশীল, তাঁকেও জিজ্ঞাসা করা হবে।
কুরআনে পরিবারের প্রতি দায়িত্বের ভাষা আরও স্পষ্ট:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قُوٓا۟ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًۭا
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।
“নিজেদের” এবং “পরিবারকে” — একই বাক্যে, একই দায়িত্বের অধীনে। ইসলামে ব্যক্তির নাজাত ও পরিবারের নাজাত আলাদা প্রকল্প নয়।
আর সহাবস্থানের সীমা নির্ধারণে একটি সংক্ষিপ্ত নীতি ফিকহের ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে আছে:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
ক্ষতি করা যাবে না, এবং ক্ষতির বদলা ক্ষতি দিয়ে নেওয়া যাবে না।
এটিই ইসলামের “ক্ষতির নীতি” — কিন্তু আধুনিক সংস্করণের চেয়ে প্রশস্ত, কারণ এখানে ক্ষতির সংজ্ঞা কেবল বস্তুগত নয়।
করণীয়
যিনি নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার দাবি করছেন — আপনার দাবি বৈধ হতে পারে। কিন্তু বলার ভাষা বদলান। “এটা আমার ব্যাপার” বলার বদলে বলুন, “এই সিদ্ধান্তটি আমি এই কারণে নিতে চাই, এবং এতে আপনাদের ওপর যে প্রভাব পড়বে তা আমি এভাবে সামলাব।” প্রথম বাক্যটি দেয়াল তোলে; দ্বিতীয়টি দরজা খোলে।
যিনি পরিবারের কর্তা — সিদ্ধান্ত চাপানোর আগে একটি প্রশ্নের উত্তর দিন: এই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমার কাছে শরিয়তের দলিল আছে, নাকি কেবল প্রথা আর “লোকে কী বলবে” আছে? দ্বিতীয়টি হলে সেটি দ্বীন নয়, আপনার নিজের ইচ্ছা — যা আপনি ঠিক সেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দোষে দুষ্ট, যার সমালোচনা আপনি করছেন।
উভয়ের জন্য একটি অভ্যাস — পারিবারিক সিদ্ধান্তে পরামর্শ (শুরা) ফিরিয়ে আনুন। সবাই মিলে বসা, প্রত্যেকের কথা শোনা, তারপর সিদ্ধান্ত। এটি কেবল ভদ্রতা নয়; কুরআনে বর্ণিত পদ্ধতি। এবং এটি একমাত্র প্রক্রিয়া যেখানে ব্যক্তির কণ্ঠস্বর ও পরিবারের ঐক্য — দুটিই বেঁচে থাকে।
