একজন মানুষ ফজরের নামাজ পড়েন। তারপর ফোন হাতে নিয়ে বিছানায় বসে চল্লিশ মিনিট স্ক্রল করেন। উঠে অফিসে যান, সেখানে আট ঘণ্টা এমন কাজ করেন যার সঙ্গে তাঁর জীবনের কোনো গভীর অর্থের সম্পর্ক নেই। ফিরে এসে ক্লান্ত শরীরে আবার ফোন হাতে নেন। রাতে ঘুমানোর আগে ভাবেন — আজ সারাদিনে আসলে কী করলাম।
এই মানুষটি ধার্মিক। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, সুদ থেকে বাঁচেন, রমজানে রোজা রাখেন। তাঁর জীবনে কোনো স্পষ্ট গুনাহ নেই। তবু তাঁর ভেতরে একটি অস্বস্তি আছে যার নাম তিনি জানেন না।
এই লেখাটি সেই নামটি খোঁজার চেষ্টা।
আমরা যা ভুল বুঝি
“আধুনিকতা” শব্দটি শুনলে আমাদের মাথায় আসে বিদ্যুৎ, উড়োজাহাজ, ইন্টারনেট, হাসপাতাল। এই বোঝাপড়া অনুযায়ী আধুনিকতার বিরুদ্ধে কথা বলা মানে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলা — যা শুনতে হাস্যকর, কারণ আমরা সবাই মোবাইল ব্যবহার করি।
কিন্তু চিন্তার জগতে আধুনিকতা (Modernity) বলতে যন্ত্র বোঝায় না। বোঝায় একগুচ্ছ ধারণা — মানুষ কী, সময় কী, প্রকৃতি কী, কর্তৃত্ব কোথা থেকে আসে, আর ভালো জীবন কাকে বলে। যন্ত্রগুলো এই ধারণাগুলোর ফল, কারণ নয়।
পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মোবাইল ফোন নিরপেক্ষ যন্ত্র — আপনি তাতে কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পারেন। কিন্তু “আমার সময় আমার সম্পত্তি, আমি যেভাবে খুশি খরচ করব” — এটি যন্ত্র নয়, এটি একটি দাবি। এবং এই দাবিটি নিরপেক্ষ নয়।
চারটি নীরব ধারণা
আধুনিকতা আমাদের কাছে যুক্তি দিয়ে আসেনি। এসেছে স্বাভাবিকতা হিসেবে — এমন কিছু যা নিয়ে প্রশ্নই ওঠে না। চারটি ধারণা লক্ষ করুন।
এক — মানুষই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ।
আগের পৃথিবীতে প্রশ্ন ছিল “আমাকে কী করতে বলা হয়েছে?” আধুনিক পৃথিবীতে প্রশ্ন হলো “আমি কী করতে চাই?” এই একটি বাক্য বদলে যাওয়ার মধ্যে পুরো সভ্যতার বদল লুকিয়ে আছে। মানুষ এখন নিজের ইচ্ছার নিচে আর কোনো কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে না।
দুই — নতুন মানেই উন্নত।
ইতিহাস একটি সিঁড়ি, এবং আমরা সবসময় উপরের ধাপে আছি — এটিই আধুনিক বিশ্বাস। এর ফলে অতীত হয়ে যায় অন্ধকার যুগ, আর পুরনো কোনো নির্দেশনা মানেই “সেকেলে”। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন: সময় এগোলেই মানুষ উন্নত হয় না।
তিন — জীবনের অর্থ ভেতর থেকে তৈরি করতে হয়।
আধুনিক মানুষকে বলা হয়েছে, জীবনের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ নেই; তোমাকে নিজের অর্থ নিজেই বানাতে হবে। শুনতে মুক্তির মতো লাগে। বাস্তবে এটি একটি অসম্ভব বোঝা — কারণ প্রতিটি মানুষকে একা একা পুরো অস্তিত্বের প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হচ্ছে।
চার — যা মাপা যায়, তা-ই বাস্তব।
আধুনিক জ্ঞানব্যবস্থায় বৈধ জ্ঞান মানে পরিমাপযোগ্য জ্ঞান। ফলে ওহি, ইলহাম, আত্মা, বরকত — এসব ধারণা “বাস্তব”-এর তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। বাদ পড়ে না বলে যে সেগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, বরং শুধু এই কারণে যে সেগুলো ল্যাবরেটরিতে ধরা পড়ে না।
এটি কোথা থেকে এল
সংক্ষেপে বললে, আধুনিকতা ইউরোপের নিজস্ব ইতিহাসের ফল — এবং সেই ইতিহাস আমাদের নয়।
ইউরোপে গির্জা ছিল একটি রাজনৈতিক শক্তি, যে বিজ্ঞানীকে শাস্তি দিত এবং রাজাকে নিয়ন্ত্রণ করত। ধর্মযুদ্ধে লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার পর ইউরোপীয় চিন্তাবিদরা সিদ্ধান্ত নিলেন — ধর্মকে জনজীবন থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কোঠায় পাঠাতে হবে। এটি ছিল তাঁদের সমস্যার তাঁদের সমাধান।
কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এমন কোনো গির্জা ছিল না। এখানে আলেম কোনো পুরোহিত-শ্রেণি নন, ইলম কারও একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, এবং জ্ঞান-অন্বেষণ কখনো ধর্মদ্রোহ ছিল না — বরং ইবাদত ছিল।
তাই ইউরোপের রোগের ওষুধ আমাদের গায়ে প্রয়োগ করা হয়েছিল উপনিবেশের হাত ধরে, রোগ নির্ণয় ছাড়াই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আইনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকাঠামো — সবই সেই আমদানির চিহ্ন বহন করে। আজও আমাদের ছেলেমেয়েদের দুটি আলাদা ব্যবস্থায় পড়তে হয়, যেন দ্বীন আর দুনিয়া দুটি আলাদা বিষয়।
যা স্বীকার করতেই হবে
এখানে সৎ হওয়া জরুরি।
আধুনিকতা কেবল ক্ষতি করেনি। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, মহামারি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, দুর্ভিক্ষ বিরল হয়েছে, দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালে এসেছে। আজ একজন সাধারণ বাংলাদেশি তরুণ ঘরে বসে ইমাম গাজালির গ্রন্থ পড়তে পারেন — যা দুইশ বছর আগে একজন আলেমের পক্ষেও কঠিন ছিল।
যে সমালোচনা এই বাস্তবতাগুলো অস্বীকার করে, সে সমালোচনা কেউ শোনে না — এবং শোনা উচিতও নয়।
আমাদের আপত্তি অর্জনে নয়। আপত্তি দাবিতে — এই দাবিতে যে, বস্তুগত অগ্রগতিই জীবনের চূড়ান্ত মাপকাঠি, এবং মানুষের কোনো নির্দেশনার প্রয়োজন নেই।
ইসলাম কী বলে
ইসলামের অবস্থান “পুরনোকে ধরে রাখো” নয়। ইসলাম নিজেই তার সময়ের বহু প্রথা ভেঙেছিল।
ইসলামের অবস্থান হলো: মানুষ নিজে নিজের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ নয়।
وَمَا خَلَقْتُ ٱلْجِنَّ وَٱلْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যেন তারা আমার ইবাদত করে।
এই একটি আয়াত পুরো প্রশ্নটির উত্তর দেয়। জীবনের উদ্দেশ্য আবিষ্কারের বিষয় নয়, জানার বিষয়। মানুষকে শূন্য থেকে নিজের অর্থ বানাতে হবে না — অর্থ তাকে দেওয়া হয়েছে।
এবং এখানেই আধুনিক মানুষের অস্থিরতার উৎস। যাকে বলা হয়েছে “তুমি নিজেই নিজের মালিক”, সে আসলে একটি বোঝা কাঁধে নিয়েছে যা বহনযোগ্য নয়।
أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ
জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।
লক্ষ করুন, আয়াতে বলা হয়নি অন্তর আনন্দিত হয়। বলা হয়েছে প্রশান্ত হয় — ইতমিনান। আধুনিক পৃথিবী আনন্দের অভাবে ভুগছে না; আনন্দ তো উপচে পড়ছে। ভুগছে প্রশান্তির অভাবে।
তাহলে করণীয় কী
প্রথম করণীয়: নাম দেওয়া।
যখন কোনো ধারণা আপনার ভেতরে কাজ করে অথচ তার নাম আপনি জানেন না, তখন সেটি আপনার নিজের চিন্তা বলে মনে হয়। নাম জানার মুহূর্তে সেটি বাইরে চলে আসে, এবং তখনই আপনি তার সঙ্গে দূরত্ব নিতে পারেন।
আগামী কয়েক দিন একটি অভ্যাস করুন — যখনই নিজেকে বলতে শুনবেন “এটা তো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার”, “সময়টা তো আমার”, “নিজেকে সময় দেওয়া দরকার” — তখন এক মুহূর্ত থেমে জিজ্ঞেস করুন: এই কথাটি আমি কোথা থেকে শিখলাম? কুরআন থেকে? পিতামাতার কাছ থেকে? নাকি বিজ্ঞাপন থেকে?
দ্বিতীয় করণীয়: প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কটি উল্টে দেওয়া।
প্রযুক্তি ছাড়ার প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো — যন্ত্রটি কি আপনার উদ্দেশ্যের সেবা করছে, নাকি আপনি যন্ত্রের উদ্দেশ্যের সেবা করছেন? একটি সহজ পরীক্ষা: ফোন হাতে নেওয়ার আগে বলুন, “আমি এটি দিয়ে এই কাজটি করব।” কাজ শেষ হলে রেখে দিন। যদি এটি করতে না পারেন, উত্তরটি পেয়ে গেছেন।
তৃতীয় করণীয়: মডেল খোঁজা।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌۭ
নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
আধুনিকতা প্রতিটি মানুষকে বলে নিজের পথ নিজে বানাতে। ইসলাম বলে, একটি পথ দেখানো হয়েছে — এবং একজন মানুষ সেই পথে হেঁটে দেখিয়ে গেছেন যে এটি হাঁটা যায়।
এই দুই বাক্যের মধ্যে দূরত্বটুকুই আমাদের সময়ের মূল প্রশ্ন।
