মূল লেখায় যান
,

যবানের হেফাজত: যে ছোট অঙ্গটি সংসার ভাঙে

আমাদের সমাজে সম্পর্ক ভাঙে বড় অপরাধে নয় — প্রতিদিনের ছোট কথায়

কাগজে একটি সরু ফাটল, যা ধীরে ধীরে চওড়া হয়েছে

একটি মজলিস। চা আসছে, কথা জমেছে।

কেউ একজন বললেন, “অমুকের ছেলেটা তো বিদেশ গেল, শুনেছেন? বাবার কী অবস্থা এখন…”

আরেকজন যোগ করলেন, “আরে ওই পরিবারের অবস্থা তো আগেই খারাপ ছিল, আপনি জানেন না?”

তৃতীয়জন হাসলেন।

কেউ মিথ্যা বলেননি। কেউ কাউকে গালি দেননি। মজলিস শেষে সবাই বাড়ি ফিরলেন, এবং কারও মনে হলো না আজ কোনো গুনাহ হয়েছে।

এই মজলিসটি আমাদের সমাজের সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্য। এবং কুরআনের ভাষায় এটি একটি ভয়ংকর দৃশ্য।

কুরআনের রূপকটি

وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًۭا فَكَرِهْتُمُوهُ

তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো এতে ঘৃণাবোধ করো।

সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২

কুরআন সাধারণত অলংকারে সংযত। এখানে যে রূপকটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা ইচ্ছাকৃতভাবে বিরক্তিকর — কারণ যে কাজটিকে আমরা তুচ্ছ ভাবি, তার প্রকৃত রূপ দেখানো দরকার ছিল।

রূপকের তিনটি স্তর লক্ষ করুন। গোশত — অর্থাৎ সম্মান, একজন মানুষের সবচেয়ে সংবেদনশীল জিনিস। ভাইয়ের — অর্থাৎ যাঁর কথা বলছেন তিনি অপরিচিত নন। মৃত — অর্থাৎ তিনি সেখানে নেই, আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারছেন না।

শেষ শব্দটিই গিবতের প্রকৃত অন্যায়। মানুষটি অনুপস্থিত।

সংজ্ঞাটি নবীজি ﷺ নিজে দিয়েছেন

আমরা প্রায়ই বলি, “আমি তো মিথ্যা বলিনি, যা সত্য তা-ই বলেছি।” এই অজুহাতটি হাদিসে আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা জানো গিবত কী?” সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন:

ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ

তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে।

সহিহ মুসলিম

তখন কেউ জিজ্ঞেস করলেন, “যদি সেটি তার মধ্যে সত্যিই থাকে?” তিনি বললেন — যদি থাকে তবেই তো গিবত হলো; আর যদি না থাকে, তাহলে তো তুমি অপবাদ দিলে।

অর্থাৎ সত্য বলা গিবতের অজুহাত নয়, বরং গিবতের সংজ্ঞা।

আমাদের সমাজের বিশেষ রোগ

উপমহাদেশে গিবত কেবল গুনাহ নয় — সামাজিক বিনোদন।

আমাদের মজলিসে যদি কারও সমালোচনা না থাকে, আলোচনা জমে না। আমাদের নারীদের বৈঠকে, পুরুষদের চায়ের আড্ডায়, আত্মীয়দের দাওয়াতে — অন্যের ঘরের খবরই প্রধান খাদ্য।

আরও গভীর সমস্যা হলো, আমরা এটিকে দ্বীনদারির মোড়কে পরিবেশন করি: “ভাই, ওই লোকটার ব্যাপারে একটু সাবধান থাকবেন…” — এবং তারপর দশ মিনিটের বিস্তারিত। “আমি তো কারও নামে বলি না, তবে যা সত্য…” — এবং তারপর নাম।

আরেকটি স্থানীয় রূপ হলো দুশ্চিন্তার মোড়ক: “আহারে, ওদের অবস্থা যা হয়েছে… আল্লাহ হেফাজত করুন” — এবং তারপর পুরো ঘটনার বিবরণ। দুআর বাক্যটি কেবল প্রবেশপথ।

ঘরের ভেতরের যবান

কিন্তু গিবতের চেয়েও যে ক্ষতিটি বেশি হয়, সেটি হয় ঘরের ভেতরে — এবং সেটির কোনো নামও আমরা দিই না।

খোঁটা। “তোমার বাবার বাড়ি থেকে কী পেয়েছি?” “আমার সংসারে এসে…” “এতদিন খাওয়ালাম, তার প্রতিদান এই?” এই বাক্যগুলো ছুরির মতো, এবং এগুলো বছরের পর বছর মনে থাকে। কুরআন দানের পর খোঁটা দেওয়াকে দান বাতিল হওয়ার কারণ বলেছে — যে খোঁটা সম্পর্ক নষ্ট করে, তার হুকুম কী হবে?

তুলনা। “অমুকের বউ তো…” “অমুকের ছেলে তো…” তুলনা মানুষকে উন্নত করে না; তুলনা মানুষের ভেতরের মর্যাদাবোধ ভাঙে।

ঠাট্টা। এটিই সবচেয়ে ধোঁকাবাজ। কেউ কিছু বলল, অপরজন আহত হলো, তখন বলা হয় — “আরে, মজা করছিলাম!” কিন্তু মজা তখনই মজা, যখন দুজনেই হাসেন। একজন হাসলে আর একজন চুপ করে গেলে সেটি মজা নয়, আঘাত।

কুরআনে ঠাট্টা প্রসঙ্গে সরাসরি নিষেধ আছে, এবং তার কারণটি গভীর: হতে পারে যাঁকে তুচ্ছ করা হচ্ছে, তিনি আল্লাহর কাছে তুচ্ছকারীর চেয়ে উত্তম।

নীরবতা। এবং সবচেয়ে বিস্মৃত রূপটি — যা বলা হয় না। বছরের পর বছর একটি ঘরে দুজন মানুষ পাশাপাশি থাকেন এবং প্রয়োজনের বাইরে একটি বাক্যও বিনিময় হয় না। এটি কোনো ঝগড়া নয়, তাই কেউ একে সমস্যা বলে চিনতেই পারে না। অথচ এটি ধীরগতির মৃত্যু।

দুই কাঁধে দুজন লেখক

مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌۭ

সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন প্রস্তুত প্রহরী থাকেই।

সূরা ক্বাফ, আয়াত ১৮

আয়াতটির শব্দচয়ন লক্ষ করুন — মা ইয়ালফিযু মিন কাওলিন, “যে কথাই সে উচ্চারণ করে”। বড় কথা, ছোট কথা — কোনো পার্থক্য নেই। রান্নাঘরে বলা একটি খোঁটা, চায়ের দোকানে বলা একটি ঠাট্টা — সবই লেখা হচ্ছে।

আমরা সাধারণত ভাবি বড় গুনাহই লেখা হয়। আয়াত বলছে না।

সমাধান: একটি সরল হাদিস

রাসূলুল্লাহ ﷺ পুরো বিষয়টির সমাধান একটি বাক্যে দিয়েছেন:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

এখানে দুটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়।

প্রথমত, হাদিসটি ঈমানের সঙ্গে যুক্ত। “যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে” — অর্থাৎ কথা বলার সংযম কেবল ভদ্রতা নয়, ঈমানের প্রকাশ।

দ্বিতীয়ত, বিকল্প মাত্র দুটি: ভালো কথা, অথবা নীরবতা। “সত্য কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কথা” বলে কোনো তৃতীয় ক্যাটাগরি নেই।

আরেকটি হাদিসে এসেছে — একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে তা-ই বলে বেড়ায় (সহিহ মুসলিম)। আজকের হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকের যুগে এই হাদিসটি নতুন করে পড়া দরকার।

করণীয় — চারটি অভ্যাস

এক — তিনটি প্রশ্ন।
কিছু বলার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: এটি কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়? এটি কি দয়ালু? তিনটির যেকোনো একটির উত্তর “না” হলে চুপ থাকুন। প্রথম দিন কঠিন লাগবে; সাত দিনে অভ্যাস হয়ে যাবে।

দুই — মজলিস বদলানোর সাহস।
যেখানে গিবত শুরু হয়, সেখানে বিষয় পাল্টে দিন — কৌশলে, কাউকে লজ্জা না দিয়ে। কাজ না হলে উঠে আসুন। একবার উঠে এলে দ্বিতীয়বার সেই মজলিসে গিবত শুরু হওয়ার আগে সবাই একবার আপনার দিকে তাকাবে। এটিই নীরব দাওয়াহ।

তিন — ঘরে চব্বিশ ঘণ্টার একটি পরীক্ষা।
আগামীকাল ঠিক করুন, ঘরের ভেতরে কোনো খোঁটা, কোনো তুলনা, কোনো ঠাট্টা নয়। একটি দিন। অধিকাংশ মানুষ প্রথম দিনেই আবিষ্কার করেন, তাঁদের দৈনন্দিন কথার কত বড় অংশ এই তিনটি জিনিস দখল করে আছে।

চার — ক্ষমা চাওয়ার হিসাব।
যাঁদের নিয়ে আপনি গিবত করেছেন, তাঁদের একটি তালিকা করুন। কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া সম্ভব — চান। কিছু ক্ষেত্রে বলতে গেলে নতুন করে কষ্ট দেওয়া হবে (তিনি জানতেনই না) — সেখানে আলেমদের মত হলো, তাঁর জন্য দুআ করুন, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রশংসা করুন, এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।

কথা তীরের মতো। ছোড়ার আগে হাতে থাকে; ছোড়ার পর আর ফেরানো যায় না।

সারকথা

  • গিবতের সংজ্ঞা রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে দিয়েছেন — এবং তাতে সত্য বলাও অজুহাত নয়।
  • আমাদের সমাজে গিবত মজলিসের বিনোদন হয়ে গেছে; আমরা এটিকে গুনাহ বলেই মনে করি না।
  • “ঠাট্টা করেছি” — এই অজুহাতে বলা কথাগুলোই পরিবারে সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
  • চুপ থাকা একটি সক্রিয় আমল, নিষ্ক্রিয়তা নয়; হাদিসে একে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
  • কথা একবার বেরিয়ে গেলে ফেরানো যায় না — ক্ষমা চাইলেও ক্ষত থাকে।

সূত্রপঞ্জি

আল-কুরআন

  • সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২
  • সূরা ক্বাফ, আয়াত ১৮

হাদিস

  • সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম — “যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে”
  • সহিহ মুসলিম — গিবতের সংজ্ঞা সম্পর্কিত হাদিস

এ বিষয়ে আরও পড়তে

  • আল-আযকার — কিতাবু হিফযিল লিসান ইমাম নববি আরবি যবান-সংক্রান্ত হাদিসের সবচেয়ে সুবিন্যস্ত সংকলন ও ব্যাখ্যা।
  • ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন — আফাতুল লিসান অধ্যায় ইমাম গাজালি আরবি যবানের বিশটি রোগ ধরে ধরে বিশ্লেষণ। প্রতিটি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা আলাদা করে বলা আছে।
  • আল-আদাবুল মুফরাদ ইমাম বুখারি আরবি কথা বলার আদব-সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো ঘরে পড়ার জন্য উপযুক্ত।

গবেষণার দিক

ফিকহে গিবতের বৈধ ব্যতিক্রমসমূহ (পরামর্শ, ফরিয়াদ, সতর্কীকরণ) — এবং সমকালীন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রেক্ষাপটে সেই ব্যতিক্রমগুলোর সীমা নির্ধারণ।