মূল লেখায় যান
,

বস্তুবাদ: যে দর্শন মানুষকে দেহে নামিয়ে এনেছে

যদি কেবল বস্তুই বাস্তব হয়, তাহলে ন্যায়, প্রেম ও কর্তব্য কী

পাথরের দেয়ালে আলো-ছায়ার বিমূর্ত জ্যামিতিক বিভাজন

একটি বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। ছেলেটি নামাজি, সৎ, ভদ্র। কিন্তু বেতন কম, এবং নিজের ফ্ল্যাট নেই।

মেয়ের পরিবার বসে আলোচনা করছেন। কেউ প্রকাশ্যে বলছেন না যে টাকাই মুখ্য — সবাই বলছেন “ভবিষ্যতের নিরাপত্তা”, “বাস্তবতা”, “মেয়েটার কষ্ট হবে”। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে যে জিনিসটি আছে, সেটি একটি সংখ্যা।

এই পরিবারটি ধার্মিক। তাঁরা নিয়মিত নামাজ পড়েন। তাঁরা নিজেদের কখনো “বস্তুবাদী” ভাববেন না।

কিন্তু বস্তুবাদ ঠিক এইভাবেই কাজ করে — দর্শন হিসেবে নয়, সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হিসেবে।

দাবিটি কী

দার্শনিকভাবে বস্তুবাদের (Materialism) মূল দাবি একটি বাক্যে বলা যায়:

> যা কিছু বাস্তব, তা বস্তু — অথবা বস্তুর ক্রিয়া। এর বাইরে কিছু নেই।

অর্থাৎ মন বলতে যা বোঝায় তা মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রক্রিয়া; ভালোবাসা বলতে যা বোঝায় তা হরমোনের খেলা; নৈতিকতা বলতে যা বোঝায় তা টিকে থাকার জন্য বিবর্তনের কৌশল।

লক্ষ করুন, এই দাবিটি বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার নয়। কোনো পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়নি যে অবস্তুগত কিছু নেই — কারণ পরীক্ষা কেবল বস্তুই মাপতে পারে। এটি বিজ্ঞানের ফল নয়, বিজ্ঞানের শুরুতে করা একটি অনুমান। অনুমানকে ফল বলে চালিয়ে দেওয়াই এখানকার প্রধান কৌশল।

দাবিটি মানলে কী দাঁড়ায়

ধরে নিলাম দাবিটি সত্য। তাহলে কয়েকটি জিনিস স্বীকার করতে হবে।

ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই। একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা “খারাপ” — এই বাক্যটি যদি কেবল রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা হয়, তাহলে এটি সত্য বা মিথ্যা কিছুই নয়, নিছক একটি অনুভূতি। কিন্তু বাস্তবে কোনো বস্তুবাদীও এভাবে বাঁচেন না। তাঁর সঙ্গে অন্যায় হলে তিনি বলেন “এটা অন্যায়” — এবং বোঝাতে চান, তা সত্যিই অন্যায়, কেবল তাঁর অপছন্দ নয়।

মানুষের কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই। যদি মানুষ কেবল জটিল রাসায়নিক ব্যবস্থা হয়, তাহলে তার মর্যাদা কোথা থেকে আসে? জটিলতা থেকে? তাহলে যে বেশি জটিল, সে বেশি মর্যাদাবান — এবং যে কম, সে কম। এই যুক্তির পরিণতি বিশ শতকের ইতিহাসে লেখা আছে।

জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই। উদ্দেশ্য মানে কারও ইচ্ছা। ইচ্ছা মানে চেতনা। কেউ যদি না থাকেন, তবে উদ্দেশ্যও নেই — কেবল ঘটনা আছে।

আমাদের সমাজে এটি কীভাবে এসেছে

উপমহাদেশে বস্তুবাদ দর্শনের বই হয়ে আসেনি। এসেছে তিনটি নীরব রূপে।

প্রথম রূপ — সাফল্যের সংজ্ঞা। “ছেলেটা ভালো করেছে” বললে আমরা কী বোঝাই? চরিত্র? আমানতদারি? মা-বাবার সেবা? না — আমরা বোঝাই বেতন, পদ, বা বিদেশ। সাফল্যের একটি সংজ্ঞা আমরা এতটাই স্বাভাবিক ভেবে নিয়েছি যে অন্য কোনো সংজ্ঞা আছে বলেই মনে হয় না।

দ্বিতীয় রূপ — মানুষ পরিমাপের একক। কাউকে চেনার আগে আমরা জেনে নিই তিনি কী করেন এবং কত আয় করেন। এই দুটি তথ্য দিয়ে আমরা তাঁর পুরো মানুষটিকে অনুমান করে ফেলি।

তৃতীয় রূপ — সমাধানের ধারণা। ছেলের চরিত্র নষ্ট হচ্ছে? ভালো স্কুলে ভর্তি করান। মন খারাপ? ঘুরতে যান। সম্পর্ক খারাপ? উপহার দিন। প্রতিটি সমস্যার সমাধান কোনো না কোনো কেনাকাটা — এটিই বস্তুবাদের সবচেয়ে গভীর প্রবেশ।

কুরআনের ভাষ্য

কুরআন এই মনোভাবকে চৌদ্দশ বছর আগে চিহ্নিত করেছে, এবং একটি অসাধারণ শব্দে — তাকাসুর, অর্থাৎ বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা।

أَلْهَىٰكُمُ ٱلتَّكَاثُرُ ۝ حَتَّىٰ زُرْتُمُ ٱلْمَقَابِرَ

প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে — এমনকি তোমরা কবরে পৌঁছে যাও।

সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত ১–২

শব্দটি খেয়াল করুন: আলহাকুম — “তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে”। কুরআন বলছে না যে সম্পদ হারাম। বলছে, সম্পদের প্রতিযোগিতা মনোযোগ দখল করে নেয়, এবং মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ টের পায় না যে সে কী ভুলে ছিল।

আরেকটি আয়াতে কারণটি আরও গভীরে দেখানো হয়েছে:

كَلَّآ إِنَّ ٱلْإِنسَٰنَ لَيَطْغَىٰٓ ۝ أَن رَّءَاهُ ٱسْتَغْنَىٰٓ

কখনো নয়, মানুষ অবশ্যই সীমা ছাড়িয়ে যায় — যখন সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।

সূরা আল-আলাক, আয়াত ৬–৭

সমস্যাটি সম্পদে নয়, অভাবমুক্ততার অনুভূতিতে। যে মানুষ মনে করে তার আর কিছু দরকার নেই, সে আর কারও কাছে হাত পাতে না — আল্লাহর কাছেও না।

এবং হাদিসে মানুষের এই ক্ষুধার প্রকৃতি নির্মমভাবে সত্য করে বলা হয়েছে:

لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لَابْتَغَى ثَالِثًا

আদম সন্তানের যদি সম্পদের দুটি উপত্যকা থাকত, সে তৃতীয়টি চাইত।

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

এটিই বস্তুবাদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা। সে যে তৃপ্তির প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই তৃপ্তি তার কাছে নেই — কারণ ক্ষুধাটি বস্তুগত নয়।

ইসলাম বস্তুকে অস্বীকার করে না

এখানে একটি ভুল বোঝাবুঝি দূর করা দরকার।

ইসলাম দুনিয়াবিমুখতা শেখায় না। সাহাবিদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন প্রচুর সম্পদের অধিকারী ব্যবসায়ী, এবং তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের একজন। সম্পদ নিজে নিরপেক্ষ; প্রশ্ন হলো সে কোথায় বসে আছে — আপনার হাতে, নাকি আপনার অন্তরে।

পার্থক্যটি এক বাক্যে: বস্তুবাদ বলে বস্তুই সব; ইসলাম বলে বস্তু একটি উপায়।

وَلَا تَكُونُوا۟ كَٱلَّذِينَ نَسُوا۟ ٱللَّهَ فَأَنسَىٰهُمْ أَنفُسَهُمْ

তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে তাদের নিজেদের সম্পর্কেই ভুলিয়ে দিয়েছেন।

সূরা আল-হাশর, আয়াত ১৯

আয়াতটির যুক্তি লক্ষ করুন। আল্লাহকে ভোলার শাস্তি কেবল আখিরাতে নয় — শাস্তি হলো নিজেকে ভুলে যাওয়া। যে মানুষ নিজের উৎস ও গন্তব্য জানে না, সে নিজেকেই চেনে না। আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে প্রচলিত প্রশ্ন — “আমি আসলে কে?” — এই আয়াতের একটি জীবন্ত ভাষ্য।

করণীয়

একটি প্রশ্ন নিজেকে করুন, সপ্তাহে একবার: গত সাত দিনে আমি যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছি, সেগুলোর মাপকাঠি কী ছিল? লাভ-ক্ষতি? লোকের চোখ? নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টি?

একটি অভ্যাস বদলান: সন্তানের প্রশংসা করার সময় ফলাফলের বদলে চরিত্রের প্রশংসা করুন। “তুমি প্রথম হয়েছ” নয় — “তুমি সত্য বলেছ”, “তুমি ভাগ করে নিয়েছ”। শিশুরা যা শুনে বড় হয়, সেটিই তাদের সাফল্যের সংজ্ঞা হয়।

একটি জিনিস অকারণে দান করুন: এমন কিছু, যার বিনিময়ে কোনো প্রশংসা, কোনো স্বীকৃতি, কোনো প্রতিদান আসবে না। বস্তুবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরাসরি প্রতিরোধ তর্ক নয় — নিঃস্বার্থ দান। কারণ দান প্রমাণ করে, আপনার কাছে সম্পদের চেয়ে বড় কিছু আছে।

সারকথা

  • বস্তুবাদের মূল দাবি: যা মাপা যায়, কেবল তা-ই বাস্তব। এটি প্রমাণিত সত্য নয়, একটি অনুমান।
  • এই অনুমান সত্য হলে ন্যায়-অন্যায়, মর্যাদা ও কর্তব্য কোনোটিরই ভিত্তি থাকে না — কারণ এগুলোর কোনোটিই মাপা যায় না।
  • বস্তুবাদ আমাদের সমাজে দর্শন হিসেবে নয়, সাফল্যের সংজ্ঞা হিসেবে এসেছে।
  • ইসলাম বস্তুকে অস্বীকার করে না; বস্তুকে চূড়ান্ত বলাকে অস্বীকার করে।
  • একজন ধার্মিক মানুষও কার্যত বস্তুবাদী হতে পারেন — যদি তাঁর সিদ্ধান্তের মাপকাঠি কেবল লাভ-ক্ষতি হয়।

সূত্রপঞ্জি

আল-কুরআন

  • সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত ১–২
  • সূরা আল-আলাক, আয়াত ৬–৭
  • সূরা আল-হাশর, আয়াত ১৯

হাদিস

  • সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম — আদম সন্তানের দুই উপত্যকা সম্পর্কিত হাদিস

এ বিষয়ে আরও পড়তে

  • তাহাফুতুল ফালাসিফা ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি আরবি দার্শনিক অনুমানকে প্রমাণ থেকে আলাদা করার পদ্ধতি শেখার জন্য ইসলামি ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
  • মা যা খাসিরাল আলাম বিনহিতাতিল মুসলিমীন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী আরবি বস্তুবাদী সভ্যতার নৈতিক পরিণতি নিয়ে অধ্যায়গুলো বিশেষভাবে পড়ার মতো।
  • The Divine Reality: God, Islam and The Mirage of Atheism হামজা আন্দ্রিয়াস জর্টিস ইংরেজি সমকালীন নাস্তিক্যবাদী যুক্তির সরাসরি জবাব, আধুনিক দর্শনের ভাষায়।

গবেষণার দিক

উনিশ শতকের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ থেকে একুশ শতকের ভোগবাদী বস্তুবাদে রূপান্তর — এবং উপমহাদেশে এই রূপান্তরের বাহক হিসেবে বিজ্ঞাপন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা।